বিদ্যালয় ভবনের সামনে একচিলতে খোলা জায়গা। সেখানে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য আছে স্লিপার, ঢেঁকি ও দোলনার মতো খেলার সামগ্রী। কিন্তু সেগুলো সব নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, খেলার উপায় নেই। অন্যদিকে, এগুলোর কারণে মাঠটিও ব্যবহার করতে পারছে না শিশুরা। তাদের খেলতে হয় ভবনের বারান্দায় বা শ্রেণিকক্ষে। এমন দৃশ্য মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
সাটুরিয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৮০টি। এর মধ্যে ৪৫টিতে খেলার কোনো মাঠ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে ৩৩ শতাংশ জমি প্রয়োজন হয়। সাটুরিয়ার অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এখন আর এ পরিমাণ জায়গা খালি নেই। সেখানে একাধিক স্কুল ভবন করা হয়েছে। নতুন ও পুরোনো ভবনের কারণে খোলা জমি তথা খেলার জন্য মাঠ আর নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করেও জমি নষ্ট করা হয়েছে। কিছু বিদ্যালয়ে খেলার সামগ্রী স্থাপন করায় খোলা থাকা অবশিষ্ট জমিও সংকুচিত হয়ে গেছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি) ২, ৩ ও ৪ এর আওতায় ৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫টিতে শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলার সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্লিপার, ঢেঁকি ও দোলনা। ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন অর্থবছরে এগুলো স্থাপনে সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব খেলার সামগ্রী নষ্ট হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেগুলো সংস্কার করা হয়নি বা অপসারণ করে মাঠ শিশুদের খেলার উপযোগীও করা হয়নি। ফলে শিশুরা সেগুলো যেমন ব্যবহার করতে পারছে না, তেমনি স্কুলের মাঠেও ঠিকমতো খেলতে পারছে না। তারা শ্রেণিকক্ষে বা ভবনের বারান্দায় খেলা করে।
গত কয়েকদিনে উপজেলার কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। কিছু বিদ্যালয়ে দেখা যায়, কোমলমতি শিশুরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে গ্রামীণ খেলা ছিবন্নি, গোল্লাছুট, কপালটুক্কাসহ এ ধরনের খেলায় মগ্ন। কোনো কোনো বিদ্যালয় ভবনের সামনে খেলার মাঠ নেই। কোনোটিতে মাঠ থাকলেও তা নষ্ট স্লিপার দোলনার দখলে। অবশিষ্ট যেটুকু জায়গা আছে, তা সব শিশুর খেলার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
উপজেলার ফুকুরহাটি পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রীনা আক্তার বলেন, আমার বিদ্যালয়ে মাঠের মাঝখানে একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ভবন পড়ে আছে। সেটি অপসারণ করলে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করতে পারত। তিনি বলেন, মাঠের অভাবে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন মৌসুমের খেলাধুলার জন্য পাশের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে শিশুদের নিয়ে যেতে হয়। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য খেলনা সামগ্রী দেওয়া হলেও সংস্কার করার জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। দোলনা, ঢেঁকি ও স্লিপারের ঝালাই ছুটে গিয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। সংস্কারের অভাবে সেগুলো পড়ে আছে।
বিদ্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাকির হোসেন বলে, খেলার মাঠ না থাকায় আমরা ফুটবল খেলতে পারি না। শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলামের মা নাসরিন আক্তার বলেন, শিশুরা স্কুলে এসে একটু খেলাধুলা করবে সে জায়গাটুকু নেই।
হরগজ বাহিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ২১৬ জন। বিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা করার জায়গা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হয় প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের খান বাড়ির মাঠে। বিদ্যালয়ের সামনে যতটুকু জায়গা আছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের কোনোরকমে সমাবেশ করা যায়।
এই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত জাহান তানফি বলে, ‘আমরা স্কুলে আসি। কিন্তু টিফিন পিরিয়ডে খেলা করতে পারি না। খেলার মাঠ না থাকায় আমাদের প্রতিবছর অনেক দূরে নিয়ে খেলাধুলা করায় স্যাররা। স্কুলের সামনে খেলার মাঠ না থাকায় আমরা পিটিও করতে পারি না।’
ধূল্লা পাড়াগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী রোজা ইসলামের মা বিথী আক্তারও বিদ্যালয়টিতে শিশুদের খেলার পরিবেশ না থাকা নিয়ে অনুযোগ জানান। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তার বলেন, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় শিশুদের জন্য দেওয়া খেলার সামগ্রী চুরি হয়ে গেছে। শিশুরা ফুটবল ও ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করে। কিন্তু মাঠ না থাকায় তারা তা খেলতে পারছে না।
মানিকগঞ্জের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শাহীন বিন আব্দুল হাই বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও শরীরচর্চা শিশুর শারীরিক মানবিক বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর চিন্তার সৃজনশীল বিকাশ ঘটে। আজ আমরা পত্রপত্রিকায় দেখতে পাই, কিশোর গ্যাং কালচার শুরু হয়েছে। তা রোধ করতে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার বিকল্প নেই।
সাটুরিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রতুল চন্দ্র সরকার বলেন, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই, এটি সত্য। পিইডিপি প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন অর্থবছরে যেসব খেলার সামগ্রী দেওয়া হয়েছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো বরাদ্দ না থাকায় সেগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় অনেক সামগ্রী চুরি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে স্কুলের স্থাপনাগুলো করায় খেলার মাঠ ছোট হয়ে গেছে।
